ডিজিটাল দুনিয়ায় ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত ডেটা ও অনলাইন অ্যাকাউন্ট সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রচলিত পাসওয়ার্ড ব্যবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে পাসওয়ার্ডের যুগ পেছনে ফেলে আধুনিক ও অধিকতর নিরাপদ প্রযুক্তি হিসেবে 'পাসকি' ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাজ্যের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র (এনসিএসসি)। সংস্থাটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, যেসব অ্যাপ, প্ল্যাটফর্ম বা ওয়েবসাইটে পাসকি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, সেখানে লগইন করার জন্য পাসওয়ার্ডের পরিবর্তে অবশ্যই পাসকি বেছে নেওয়া উচিত। বর্তমান সময়ে হ্যাকিং এবং সাইবার হামলার যে ধরন, তাতে প্রচলিত পাসওয়ার্ড আর পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
সহজ কথায় পাসকি হলো পাসওয়ার্ড ছাড়াই বিভিন্ন অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে নিরাপদে প্রবেশের একটি অভিনব পদ্ধতি। এটি ব্যবহারকারীর নিজস্ব স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের মতো যন্ত্রে সংরক্ষিত থাকে এবং অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচয় যাচাই করে অ্যাকাউন্টে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে দেয়। নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞরা পাসকি ব্যবস্থাকে একটি শক্তিশালী 'ডিজিটাল সিল' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই পদ্ধতির অন্যতম বড় সুবিধা হলো ব্যবহারকারীকে সাইটভেদে আলাদা কোনো জটিল পাসওয়ার্ড মনে রাখার ঝক্কি পোহাতে হয় না। স্মার্টফোনের ফেস রিকগনিশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, আঙুলের ছাপ কিংবা সিক্রেট পিন নম্বরের মাধ্যমে নিজের পরিচয় নিশ্চিত করলেই খুব সহজে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা সম্ভব হয়। পরিচয় যাচাই সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট বা অ্যাপ নিশ্চিত করে যে আসল ব্যবহারকারীই লগইন করার চেষ্টা করছেন।
সাইবার অপরাধের একটি বড় হাতিয়ার হলো ফিশিং আক্রমণ, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের সর্বস্বান্ত করা হয়। ফিশিংয়ের কবলে পড়ে প্রতারকেরা ভুয়া ই-মেইল, বিভ্রান্তিকর খুদে বার্তা কিংবা হুবহু নকল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ধোঁকা দিয়ে পাসওয়ার্ডসহ অন্যান্য গোপনীয় লগইন তথ্য হাতিয়ে নেয়। পরবর্তীতে এসব সংবেদনশীল তথ্য ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে পড়ে, যা ব্যবহারকারীকে চরম বিপদে ফেলে। তবে পাসকি সাধারণ পাসওয়ার্ডের মতো কোনো টেক্সট বা স্ট্রিং নয়, যা সহজেই কেউ কপি বা চুরি করতে পারে। প্রতিটি আলাদা অ্যাকাউন্টের জন্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও আলাদা পাসকি তৈরি হয়, ফলে একটি অ্যাকাউন্টের পাসকি দিয়ে অন্য কোনো অ্যাকাউন্টে অনধিকার প্রবেশের কোনো সুযোগ থাকে না।
প্রযুক্তির এই নতুন যুগে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও পাসকির কার্যকারিতা নিয়ে ইতিবাচক মত প্রকাশ করেছেন। পাসকি ব্যবহার করে এমন কোনো ওয়েবসাইট বা অ্যাপে যদি বড় ধরনের সাইবার হামলাও চালানো হয় এবং ডেটা ব্রোচের ঘটনা ঘটে, তবুও আক্রমণকারীরা ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে সহজে প্রবেশ করতে পারে না। কারণ মূল পরিচয় শনাক্তকরণ চাবিটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ডিভাইসের ভেতরেই নিরাপدی সংরক্ষিত থাকে, যা সার্ভার থেকে চুরি করা অসম্ভব বললেই চলে।
ভবিষ্যতে সাইবার অপরাধের মাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকায় তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা সাধারণ ব্যবহারকারীদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। পাসওয়ার্ডের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পাসকি বা বায়োমেট্রিক অথেন্টিকেশনের মতো আধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ভুয়া সাইট বা ফিশিংয়ের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা এবং নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিবেশ তৈরিতে পাসকির ব্যাপক প্রসারের ওপর এখন সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।

