পহেলা নভেম্বর থেকে দেশের প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং নয় লাখ পেনশনভোগীর জন্য নতুন পে-স্কেলের বাড়তি বেতন ও বকেয়া পরিশোধ কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। গত জুন মাসে জাতীয় সংসদে ঘোষিত এই নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারের ওপর বিশাল অংকের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা, যার মধ্যে চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মূলত মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়া এবং বাজেট ভারসাম্য বজায় রাখতে দুই বছর ধরে ধাপে ধাপে এই পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন।
শুরুতে সরকার এই বাড়তি অর্থের সংস্থান মূলত রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের মাধ্যমে করার পরিকল্পনা করেছিল। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের মতো বৈশ্বিক উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তার আশাও করা হয়েছিল। তবে অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সেই পরিকল্পনা হোঁচট খেয়েছে। সম্প্রতি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে নতুন বৈদেশিক সহায়তার তুলনায় পুরোনো ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে দ্বিগুণেরও বেশি অর্থ চলে গেছে। এই তিন মাসে ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হলেও নতুন সহায়তা এসেছে মাত্র ৬৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার।
বিদেশি ঋণের এই নিট outflows বা ঋণ পরিশোধের বাড়তি চাপের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ খাতেও তৈরি হয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যয় বৃদ্ধি এবং অন্যান্য অনুৎপাদনশীল ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আদায় হয়নি। ফলে বাধ্য হয়েই সরকারকে অভ্যন্তরীণ ঋণের ঐতিহ্যবাহী ও বিকল্প উৎসগুলোর দিকে ঝুঁকতে হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র এবং বিশেষ ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করা হচ্ছে। কেবল অক্টোবর মাসেই ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকার বড় অংকের ঋণ নিয়েছে এবং সম্প্রতি বিশেষ ১৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে আরও পাঁচ হাজার কোটি টাকার সংস্থান করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতা এবং সরকারের চলমান ব্যয় নির্বাহের প্রবণতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, সরকারের ত্রৈমাসিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় এবং বকেয়া বেতন পরিশোধের তীব্র চাপের মুখে ঋণনির্ভরতা ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না। তবে যখন সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়, তখন তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভবিষ্যতে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আরও বেশি স্বচ্ছতা ও দূরদর্শিতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একদিকে জনস্বার্থে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন-ভাতা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ঋণের বোঝা বাড়লে তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর জালের পরিধি সম্প্রসারণ এবং অপচয় রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিচ্ছেন দেশের অর্থনীতিবিদরা, যাতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ এড়িয়ে একটি টেকসই অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হয়।

