জনগণের অর্থনৈতিক বিতর্কে বাজারের ফটকা ব্যবসায়ীদের প্রায়শই আর্থিক অন্তর্ঘাতের প্রতীক হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশে এই দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত প্রবল এবং আলোচকরা তাদের শেয়ারবাজারের পতন বা ডলার সংকটের জন্য খলনায়ক হিসেবে চিত্রিত করে থাকেন। তবে এই ধরনের অভিযোগ কেবল সমস্যার মূল কারণকে আড়াল করে এবং বার্তাবাহককে দোষারোপ করার শামিল। প্রকৃত তথ্য হলো, সচেতন ও তথ্যভিত্তিক ফটকা ব্যবসায়ীরা বাজারের জন্য অপরিহার্য কিছু সেবা প্রদান করে থাকেন, যার মধ্যে রয়েছে বাজারের অবিরাম তারল্য সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক ধাক্কাগুলো সফলভাবে শোষণ করা।
বাস্তব অর্থনীতির সাথে জড়িত অংশীদাররা প্রতিদিন নিয়ম করে ব্যবসা বা লেনদেন করেন না। উদাহরণস্বরূপ, একটি উৎপাদনমুখী কারখানা শুধুমাত্র তখনই বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি করে যখন তাদের রপ্তানি বিল বা পেমেন্ট হাতে আসে। একইভাবে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেবল তখনই সরকারি ঋণপত্র ক্রয় করে যখন তাদের কাছে পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত আমানত জমা হয়। বাজার যদি সম্পূর্ণভাবে এই ধরনের প্রত্যক্ষ শেষ ব্যবহারকারীদের ওপর নির্ভরশীল থাকত, তবে লেনদেনের গতি মারাত্মকভাবে শ্লথ হয়ে যেত। সকালে ডলার বিক্রির জন্য আসা কোনো রপ্তানিকারককে ঠিক সেই মুহূর্তে ক্রেতা পাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো।
লেনদেনের এই দীর্ঘসূত্রিতা বা বিলম্ব বাজারে স্প্রেড বা কেনাবেচার ব্যবধান বাড়িয়ে দিত এবং পণ্যের দামে আকস্মিক বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটাতে পারত। এই ধরনের কাঠামোগত ঘর্ষণ বা জটিলতা দূর করতে ফটকা ব্যবসায়ীরা মুনাফার আশায় নিজ কাঁধে মূল্যের ঝুঁকি নিয়ে থাকেন। তারা ব্যবসার ক্ষেত্রে লেনদেন খরচ কমিয়ে আনেন এবং দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান সংকুচিত করেন। এর মাধ্যমে তারা একটি স্থিতিশীল মাধ্যমিক বাজার বা সেকেন্ডারি মার্কেট গড়ে তোলেন, যা ছাড়া প্রাথমিক বাজারগুলো মূলত অচল হয়ে পড়ে। মাধ্যমিক বাজারে পর্যাপ্ত তারল্য না থাকলে নতুন কোনো আর্থিক পণ্য বা ডেট ইনস্ট্রুমেন্ট বাজারে আনা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে দাঁড়াত।
গত কয়েক দশক ধরে দেশের মূলধনী বাজার নতুন এবং উদ্ভাবনী বিভিন্ন ঋণ উপকরণ প্রবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। জিরো-কুপন বন্ড, ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক সিকিউরাইজেশন এবং নানা ধরনের করপোরেট ডিবেঞ্চার বাজারে চালু করা হলেও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন অযৌক্তিক সুবিধা বা আরবিট্রাজ ব্যবস্থার কারণে মূলধনী বাজার প্রয়োজনীয় তহবিল ও গতিশীলতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বাজারকে সচল রাখতে এবং যেকোনো বাহ্যিক অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলায় মধ্যস্থতাকারী ও ফটকা ব্যবসায়ীদের ইতিবাচক ভূমিকা নতুন করে মূল্যায়নের সময় এসেছে।
অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকদের মতে, ফটকা ব্যবসায়ীদের সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা খাটো করে দেখলে বাজারে তারল্য সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করবে। বাজার অর্থনীতিতে ফটকা ব্যবসায়ীরা ঝুঁকি গ্রহণকারী হিসেবে কাজ করেন, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারীদের জন্য লেনদেন প্রক্রিয়া সহজতর করে। তাই ঢালাওভাবে তাদের দোষারোপ না করে বাজারের কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া উচিত, যাতে আর্থিক খাত আরও বেশি স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

