বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমে কিশোর অপরাধ বা জুভেনাইল ডেলিংকুয়েন্সি সংক্রান্ত সংবাদ প্রচারের ধরন নিয়ে সমাজে ব্যাপক আলোচনা ও বিশ্লেষণ চলছে। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অপ্রাপ্তবয়স্কদের নাম, ছবি বা পরিচয় প্রকাশ করার ক্ষেত্রে কতটা সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নীতি নির্ধারক ও গণমাধ্যমকর্মীরা কড়া তত্ত্বে বিশ্বাসী। চিত্রা পোস্টের বিশেষ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংবাদমাধ্যমের অতি-উৎসাহী বা চাঞ্চল্যকর পরিবেশনা অনেক সময় কিশোর অপরাধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে এবং পুনর্বাসনের সমস্ত প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিতে পারে।
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে, কিশোর বয়সের মনস্তত্ত্ব অত্যন্ত সংবেদনশীল। এই বয়সে পারিপাব্বিক অবস্থা, পারিবারিক সংকট, কিংবা সঙ্গদোষের কারণে অনেক কিশোর ভুল পথে পা বাড়াতে পারে। কিন্তু গণমাধ্যমে তাদের অপরাধের ঘটনাগুলো যেভাবে ফলাও করে প্রচার করা হয়, তাতে তারা সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ে। এর ফলে তাদের ভেতরে অপরাধী হিসেবে এক ধরণের স্থায়ী আত্মপরিচয় তৈরি হয়, যা তাদের আর মূল ধারার সমাজে ফিরে আসতে দেয় না। অপরাধ বিজ্ঞান অনুযায়ী, অপ্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের সংশোধনের সুযোগ দেওয়াটাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
সাংবাদিকতার নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, শিশু ও কিশোরদের অপরাধের সংবাদ পরিবেশনের সময় তাদের পরিচয় কঠোরভাবে গোপণ রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ীও কিশোর অপরাধীদের বিচার ও সংবাদ প্রকাশে বিশেষ সতর্কতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, লাইক-ভিউ পাওয়ার বা চাঞ্চল্য সৃষ্টির লোভে নীতিমালার তোয়াক্কা না করেই অপ্রাপ্তবয়স্কদের ছবি ও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। এই ধরণের প্রবণতা কেবল ওই কিশোরের ব্যক্তিগত জীবনকেই ধ্বংস করে না, বরং তার পুরো পরিবারকে সামাজিকভাবে এক ধরণের বয়কটের মুখে ঠেলে দেয়।
অন্যদিকে, কিশোর অপরাধ রোধে গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা পালনেরও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। শুধু অপরাধের রোমহর্ষক বিবরণ না দিয়ে এর পেছনের সামাজিক কারণ, পারিবারিক অবক্ষয়, নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং এর প্রতিকারের উপায় নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হলে তা সমাজ গঠনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মিডিয়া যদি অপরাধকে মহিমান্বিত না করে বরং সচেতনতামূলক প্রতিবেদন তৈরি করে, তবে তা তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সহায়তা করবে। এ ছাড়া অভিভাবক, শিক্ষক এবং নীতিনির্ধারকদের নিয়ে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে অপরাধের মূল উৎপাটন করা সম্ভব।
পরিশেষে, কিশোর অপরাধ বিষয়ক সংবাদ পরিবেশনে প্রতিটি গণমাধ্যমকে আরও বেশি পেশাদারিত্ব ও সংবেদনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। কেবল খবরের পেছনে ছোট না ছুটলে এবং সংবাদ প্রকাশের দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করলে তবেই একটি সুস্থ সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব। সংবাদকর্মীদের মাথায় রাখতে হবে যে, আজকের একজন বিপথগামী কিশোর সঠিক কাউন্সেলিং ও সুযোগ পেলে আগামী দিনের সম্ভাবনাময় নাগরিক হয়ে উঠতে পারে। তাই সংবাদ পরিবেশন হতে হবে শুধুই অপরাধ উন্মোচন নয়, বরং সংশোধনের পথ প্রশস্ত করার মাধ্যম।

