জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন মন্তব্য করেছেন যে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে ভোটাধিকার বা নিরাপত্তার দাবি তোলার প্রয়োজন হলেও, এখন বর্তমান সরকারের আমলে এসে নাগরিকদের নিজেদের হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশের অধিকারটুকু পাওয়ার জন্যও সংগ্রাম করতে হচ্ছে। রাজধানী ঢাকার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন।
ময়মনসিংহের নারী ব্যবসায়ী সাথী আক্তারের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে এনসিপির অঙ্গসংগঠন ‘জাতীয় নারীশক্তি’ এই মানববন্ধনের আয়োজন করেছিল। গত রোববার নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দুটি পৃথক লাইভ ভিডিও করেন ৩০ বছর বয়সী নারী ব্যবসায়ী সাথী আক্তার। ওই লাইভ ভিডিওতে তিনি চুরির ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন এবং একপর্যায়ে মন্তব্য করেন যে, বিএনপি সরকারকে ভোট দিয়ে আজ তিনি ভুক্তভোগী হয়েছেন। এই ভিডিও ক্লিপটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ওই নারী ব্যবসায়ীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘেরাও করে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানান। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই রাতেই তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। পরবর্তীতে পুলিশ তাঁকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫১ ধারার আওতায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করে। যদিও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে পরবর্তীতে স্বীকার করা হয় যে সাথীর সেই বক্তব্যে সরকারের সরাসরি কোনো সমালোচনামূলক উপাদান ছিল না, তবুও তাঁকে কারাবাসের মুখোমুখি হতে হয়।
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে আখতার হোসেন এই পুলিশি পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানান এবং প্রশ্ন তোলেন যে, সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা বা কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করার কারণে যদি সাধারণ নাগরিকদের গ্রেপ্তার করা হয়, তবে তা দেশের সংবিধান ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। তিনি বলেন, বিগত শাসন আমলের অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষ পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিল, কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে বাকস্বাধীনতা তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত হতাশা বা দুঃখ প্রকাশের স্বাধীনতাও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে এই ঘটনার পর আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সাথী আক্তার জামিন লাভ করেছেন এবং কারামুক্ত হয়েছেন। মানববন্ধনের দিন দুপুরেই তাঁর জামিন মঞ্জুর হয়। তা সত্ত্বেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় প্রশাসনের আরও দায়িত্বশীল ও সহনশীল ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনাগুলো দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ নাগরিদের কণ্ঠরোধ করার প্রবণতা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য শুভকর নয়। আখতার হোসেনের এই বক্তব্য এবং এনসিপির ধারাবাহিক প্রতিবাদী কর্মসূচি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমানা নিয়ে নতুন আলোচনার সূত্রপাত করেছে।

