২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অত্যন্ত কলঙ্কময় ও রক্তক্ষয়ী দিন হিসেবে খোদাই হয়ে আছে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন—তা নিয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চরম বিরোধ দেখা দেয়। সেই বিরোধের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল রাজধানী ঢাকার পল্টন, জিপিও এবং বায়তুল মোকাররম এলাকায়, যা মুহূর্তের মধ্যে এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট এবং জামায়াত-বিএনপি জোটের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘিরে সেদিন চারদিক উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ঘটনার দিন সকালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত চৌদ্দ দলীয় জোট বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে একটি বিশাল সমাবেশের ডাক দেয়। ঠিক একই দিনে পল্টনের মোড়ে ও এর আশপাশের এলাকায় পাল্টা সমাবেশের ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দলের এমন মুখোমুখি অবস্থান এবং শক্তি প্রদর্শনের ঘোষণা সংঘাতকে অনিবার্য করে তুলেছিল। সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা পল্টন এলাকায় জড়ো হতে শুরু করলে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
হঠাৎ করেই দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা লাঠিসোটা, রড, লগি-বৈঠা এবং এমনকি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর চড়াও হয়। মুহূর্তের মধ্যে পল্টন এলাকা এক ভয়াভয় যুদ্ধের মাঠে রূপ নেয়। পিটিয়ে এবং গুলি করে মানুষ হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটে চোখের পলকে। রাজপথে প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষের ওপর চড়াও হওয়ার সেই দৃশ্য দেশবাসীর মনে দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক ও ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তা কিংবা অপ্রতুল ভূমিকার কারণে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং বহু তাজা প্রাণ রাজপথে ঝরে পড়ে।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে। ২৮শে অক্টোবরের সহিংসতার পর দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়, যার পথ ধরে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং পরবর্তীতে সেনাসমর্থিত একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রায় দুই বছর ক্ষমতা পরিচালনা করে। ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারা পুনরায় ফিরে আসলেও রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাসের দেয়াল আরও উঁচুতে গিয়ে ঠেকে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পালাবদলে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন মামলা এবং বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
দুই দশক পেরিয়ে গেলেও ২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবরের সেই ক্ষত আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীরভাবে রেখাপাত করে আছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, এই ধরনের সহিংসতা গণতন্ত্রের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে এবং জনগণের মৌলিক অধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে রাজনৈতিক সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার কোনো বিকল্প নেই। ইতিহাসের এই নির্মম অধ্যায়টি রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষ উভয়ের জন্যই একটি বড় শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

