গত মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানী ঢাকার একাংশ থেকে শুরু করে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম পর্যন্ত দেশের একটি বিশাল অঞ্চলে হঠাৎ করে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা কিংবা চাহিদা-ঘাটতির রুটিন লোডশেডিং ছাড়াই এই আকস্মিক বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মুখে পড়েন কোটি মানুষ। প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী এই স্থবিরতার পর ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয়। তবে এই আকস্মিক জাতীয় গ্রিড বিপর্যয় কীভাবে ঘটল এবং এর মূল উৎস কোথায় ছিল, তা নিয়ে শুরু হয়েছে উচ্চপর্যায়ের অনুসন্ধান। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও উৎপাদনের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধানে একাধিক কর্মকর্তা মাঠে নেমেছেন।
পাওয়ার গ্রিড পিএলসির চারজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ ধরনের জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এর পেছনে কারিগরি বিভিন্ন দিক ও সুক্ষ্ম তথ্য বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়, যার জন্য সাধারণত কয়েক দিন সময়ের প্রয়োজন পড়ে। তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে মেঘনা ঘাট-হরিপুর সঞ্চালন লাইনের একটি নির্দিষ্ট অংশকে ঘটনার সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই লাইনের কাছাকাছি এলাকায় বেশ কিছু আকাশমণি গাছের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা বিশেষজ্ঞদের নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছে। হাইভোল্টেজ লাইনের আশপাশে গাছপালা বা ডালপালা থাকলে তা নিয়মিতভাবে পরিষ্কার করা হলেও, প্রকৃতির নানা নিয়মে দ্রুত বেড়ে ওঠা গাছের ডাল অনেক সময় স্পর্শ বা বিপজ্জনক নৈকট্যের সৃষ্টি করতে পারে।
সঞ্চালন কাজে নিয়োজিত প্রকৌশলী ও কারিগরি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার পেছনে নানা ধরনের অনুঘটক কাজ করতে পারে। বিদ্যুতের ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাঙ্কে সামান্যতম তারতম্য, সঞ্চালন লাইনে ক্ষমতার অতিরিক্ত কিংবা অপর্যাপ্ত বিদ্যুৎপ্রবাহ, এমনকি সক্রিয় লাইনে কোনো পাখি বসা বা গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ার মতো সাধারণ ঘটনাও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। সাধারণত গ্রিড ফেইলিউরের মতো বড় ঘটনায় অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষতি বা যন্ত্রাংশ পুড়ে যাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ে। তবে এবারের আকস্মিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান বড় কোনো অবকাঠামোগত ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও রহস্যজনক করে তুলেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাওয়ার গ্রিডের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, গ্রিড লাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে সবসময় বিশেষ টহল দল মাঠে সক্রিয় থাকে। তাঁরা নিয়মিতভাবে লাইনের আশপাশের গাছপালা ও ডালপালা কেটে পরিষ্কার করেন। তবে মেঘনা ঘাট-হরিপুর লাইনের মাঝামাঝি একটি দুর্গম এলাকায় আকাশমণি গাছের একটি জটলা পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, কাটার দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই হয়তো একটি গাছের ডাল দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে হাইভোল্টেজ লাইনের অত্যন্ত কাছাকাছি চলে এসেছিল। যদিও গাছটি সরাসরি লাইন স্পর্শ করেছিল কি না, তা নিয়ে আরও ফরেনসিক ও কারিগরি পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
এই আকস্মিক বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা দেশের বিদ্যুৎ খাতের অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার ত্রুটিগুলোকে আবারও নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ ও দ্রুত বর্ধমান শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে সঞ্চালন লাইনগুলোর সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরি। তদন্ত কমিটির সদস্যরা এখন মেঘনা ঘাট-হরিপুর লাইনের ওই নির্দিষ্ট স্থানটির ডিজিটাল ম্যাপিং, ফ্রিকোয়েন্সি লগ এবং রক্ষণাবেক্ষণ রেজিস্টার খতিয়ে দেখছেন।
তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর কমিটির দেওয়া সুপারিশ অনুযায়ী ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত গ্রিড বিপর্যয় রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করছে, গ্রিড লাইনের আশপাশে বৃক্ষরোপণ নীতিমালায় পরিবর্তন আনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে রিমোট মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার মাধ্যমেই কেবল এমন জাতীয় সংকট এড়ানো সম্ভব। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোও এই ঘটনার পর বিদ্যুৎ খাতের আরও টেকসই ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থাপনা দেখতে চায়।

